পূর্ববর্তী সংবাদ
মেঘনার ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জালিয়াতিসাখাওয়াত হোসেন এমভি মেঘনা প্রাইডদেশের খ্যাতনামা শিল্পোদ্যোক্তা মেঘনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডকইয়ার্ড অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি (ঋণপত্র) খুলে ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (১৫৬ কোটি ২০ লাখ টাকা) জালিয়াতি করেছে। অর্থ লোপাটের এই ঘটনার সঙ্গে বেশ কয়েকজন রাঘব-বোয়ালের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে ভয়ঙ্কর এই জালিয়াতচক্র নানাভাবে প্রভাব খাটিয়ে গোটা বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে।
জানা গেছে, মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চে এলসি খুলে সিঙ্গাপুর থেকে ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে সমুদ্রগামী একটি জাহাজ আমদানি করে এবং ঋণপত্রের চুক্তি অনুযায়ী তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে বন্ধকী দলিল করে দেয়। জাহাজটি বিক্রি বা হস্তান্তরের আগে তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানানোর সুনির্দিষ্ট শর্ত থাকলেও মেঘনা শিপ জালিয়াতি : পৃষ্ঠা ২ কলাম ৩
বিল্ডার্স তা না মেনে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ডকুমেন্ট তৈরি করে ক্রয়মূল্যের অর্ধেক দামে গোপনে জাহাজটি বিক্রি করে দেয়। অগ্রণী ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করে জাহাজ বিক্রির পুরো টাকা আত্মসাৎ করতে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স পরবর্তীকালে ওই টাকা অন্য একটি ব্যাংকের মাধ্যমে সংগ্রহ করে।
জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের ব্যাংক ঋণের টাকা আত্মসাতের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দল জানতে পারে, এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু অগ্রণী ব্যাংকের ঋণের টাকাই মেরে দেয়নি, বরং সিঙ্গাপুর থেকে আমদানিকৃত জাহাজের মূল্য দ্বিগুণের বেশি দেখিয়ে ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে বিপুল অংকের টাকা বিদেশে পাচার করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০১১ সালে মেঘনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডকইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামাল তার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আমদানিকৃত মালামাল পরিবহন এবং বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহারের কথা বলে সিঙ্গাপুর থেকে সমুদ্রগামী জাহাজ আমদানির জন্য অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চে ঋণপত্র (এলসি) খোলার আবেদন করেন। এতে আমদানিকৃত জাহাজের মূল্য ২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ১৫৬ কোটি ২০ লাখ টাকা উল্লেখ করেন। ঋণপত্র খোলার সময় ৫ শতাংশ এবং মূল্য পরিশোধকালীন ২৫ শতাংশ নিজস্ব উৎস থেকে প্রদান করার পর বাকি ৭০ শতাংশ ৫ বছর মেয়াদে ২০টি সমকিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাব দেয়া হয়। মেয়াদি ঋণের আওতায় হ্রাসকৃত হারে এলসি কমিশন, এক্সেপট্যান্স কমিশন ও সুদ আদায় সাপেক্ষে জাহাজের মোট মূল্য ৩৬০ দিন বিলম্বে পরিশোধ সাপেক্ষে একটি ডেফার্ড ঋণপত্র খোলার অনুরোধ করে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স কর্তৃপক্ষ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অগ্রণী ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঋণপত্র খোলার অনুমতি দেয় এবং এর মাধ্যমে সিঙ্গাপুর থেকে পোল্যান্ডের তৈরি নরওয়ের পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজ এমভি শ্যারিনা (গঠ ঝণজঊঘঅ) আমদানি করা হয়। সিঙ্গাপুরের সিলভিয়া শিপট্রেডস প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে ক্রয়কৃত জাহাজটি ২০১১ সালের ২৯ আগস্ট মেঘনা শিপ বিল্ডার্স গ্রহণ করে এবং তা জামানত হিসেবে অগ্রণী ব্যাংকের অনুকূলে বন্ধকী দলিল করে দেয়। জাহাজটি 'এমভি মেঘনা প্রাইড' নামকরণ করে রেজিস্ট্রেশন করা হয়।
কিন্তু এক বছরের মাথায় মেঘনা শিপ বিল্ডার্স ঋণদাতা অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে গোপনে তা ক্রয়মূল্যের অর্ধেকেরও কম দামে (১ কোটি ৩ লাখ মার্কিন ডলার) বিক্রি করে দেয়।
ব্যাংকের নথি ঘেঁটে জানা গেছে, ঋণপত্রের চুক্তিতে আমদানিকৃত ওই জাহাজটির চলাচল এবং পরিবহন ভাড়া আদায়সহ সার্বিক তথ্য ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ব্যাংককে নিয়মিত জানানোর শর্ত রয়েছে। কিন্তু মেঘনা শিপ বিল্ডার্স সেই শর্ত ভঙ্গ করে বিষয়টি শুরু থেকেই গোপন রেখেছে। রহস্যজনক কারণে অগ্রণী ব্যাংকও এক বছর এ ব্যাপারে কোনো খোঁজ নেয়নি।
তবে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স গোপনে জাহাজটি বিক্রি করে দেয়ার পর গত ৭ আগস্ট অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের একটি চিঠি [স্মারক নাম্বার- বৈবাবি/আমদানি (ক্যাশ)/৪১৪/২০১২] দিয়েছে। ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চের উপ-মহাব্যবস্থাপক জহর লাল রায়ের পাঠানো ওই চিঠিতে ব্যাংকের ঋণে কেনা জাহাজটি গত বছর ২৯ আগস্ট থেকে কোথায় কী অবস্থায় আছে এবং ওই জাহাজের ভাড়া বাবদ উপার্জিত অর্থ কোথায় জমা করা হচ্ছে, তা জরুরি ভিত্তিতে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এমভি মেঘনা প্রাইড জাহাজের মাধ্যমে বহনকৃত ১৩ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন ব্রাজিলিয়ান র ক্যান সুগারের জাহাজ ভাড়া ৯ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার কেন সিঙ্গাপুরের আইজিনা ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে (অরমরহধ ওহাবংঃসবহঃ খরসরঃবফ) প্রদান করা হয়েছে, সেই রহস্য জানতে চাওয়া হয়। ওই চিঠির কপি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের মহাব্যবস্থাপককেও দেয়া হয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহাজ কিনতে ঋণ দেয়ার এক বছর পর জাহাজের অবস্থান ও ভাড়া আদায় সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে মেঘনা শিপ বিল্ডার্সকে চিঠি দেয়ার বিষয়টি পুরোপুরি লোক দেখানো। স্রেফ দায় এড়াতেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখন নানা তৎপরতা দেখাচ্ছে। ঋণের টাকায় কেনা জাহাজটি অর্ধেকের চেয়ে কম দামে লন্ডনের নেভালমার (ইউকে) লিমিটেডের কাছে বিক্রি করে দেয়ার খবর যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই জানতে, তার প্রমাণও মিলেছে।
ব্যাকিং নথি ঘেঁটে জানা গেছে, জাহাজটির অবস্থান ও ভাড়া সংক্রান্ত তথ্য জানতে চেয়ে অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চের উপ-মহাব্যবস্থাপক জহর লাল রায় যেদিন মেঘনা শিপ বিল্ডার্সকে চিঠি দিয়েছেন, ঠিক সেদিনই মাকান্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন মো. হাবিবুর রহমানকে আরো একটি চিঠি (পিবি/এফইএক্স/ইএক্সপি/এএডি/০১৩৮/২০১২) দেয়া হয়েছে। একই কর্মকর্তার সই করা ওই চিঠিতে 'এমভি মেঘনা প্রাইড' জাহাজটি মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অগ্রণী ব্যাংকের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবে না_ এই শর্ত জানা সত্ত্বেও মাকান্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্ট কেন এই জাহাজের কোনো দায়বদ্ধতা নেই মর্মে সার্টিফিকেট দিয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, মেঘনা শিপ বিল্ডার্স নেভালমার (ইউকে) লিমিটেডের কাছে জাহাজটি বিক্রির আগে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদস্থ মাকান্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্ট থেকে গত ২৪ মে একটি প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে। মাকান্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন মো. হাবিবুর রহমান এই মর্মে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স কর্তৃপক্ষকে প্রত্যয়নপত্র দেন যে, এমভি মেঘনা প্রাইড জাহাজটি ২০১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মাকান্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্ট, চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রেশন করে। নথি অনুযায়ী জাহাজটির এই ডিপার্টমেন্টে রেজিস্টার্ড কোনো মর্গেজ নেই। সুতরাং জাহাজটি সব ধরনের রেজিস্টার্ড দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাকান্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের এই প্রত্যয়নপত্রকে পুঁজি করে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অনায়াসেই লন্ডনস্থ নেভালমার (ইউকে) লিমিটেডের কাছে বিক্রি করতে পেরেছে।
এ ব্যাপারে ক্যাপ্টেন হাবিবুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এমভি মেঘনা প্রাইডের অগ্রণী ব্যাংকে দায়বদ্ধতার বিষয়টি তিনি জানতেন না। তাই তিনি এই প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন।
একটি জাহাজের দায়বদ্ধতার বিষয় না জানার কোনো যৌক্তিক হেতু আছে কিনা, তা জানতে চাওয়া হলে হাবিবুর রহমান কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
জানা গেছে, শিপিংয়ের ডিজি কমডোর জুবায়ের আহমেদের সঙ্গে মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তার ইঙ্গিতেই মাকান্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্ট থেকে এমভি মেঘনা প্রাইডের কোনো মর্গেজ বা ঋণ নেই মর্মে প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়েছে কিনা তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০১১ সালে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স যখন এমভি মেঘনা প্রাইড কেনে, ওই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ওই মানের জাহাজের মূল্য কোনো অবস্থাতেই ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি ছিল না।
ধারণা করা হচ্ছে, মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডকইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা জাহাজটির বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান সিলভিয়া শিপট্রেড প্রাইভেট লিমিটেডের সিইও বাংলাদেশি নাগরিক মজিবুর রহমান মিলনের সঙ্গে গোপন অাঁতাত করে অসৎ উদ্দেশ্যেই ওভার ইনভয়েস করে জাহাজটির ক্রয় মূল্য ২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার দেখিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে পরে ১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ১১৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের ভয়ঙ্কর এই জালিয়াতির সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো চক্র জড়িত রয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সন্দেহ করছে। তাদের ভাষ্য, এলসির মাধ্যমে বড় অংকের অর্থে বিদেশ থেকে কোনো পণ্য আমদানির আগে আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রকৃত মূল্য কত, তা যাচাই করা হয়ে থাকে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে অগ্রণী ব্যাংকের টপ ম্যানেজমেন্ট/বোর্ড আন্তর্জাতিক বাজারে মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের কেনা জাহাজটির প্রকৃত মূল্য কত, তা যাচাই করেনি। ডিউ ডিলিজেন্স (উঁব ফরষরমবহপব) ছাড়া বিপুল অংকের অর্থ ঋণ দেয়ার কারসাজিতে অগ্রণী ব্যাংকের বিশেষ মহলের এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ দিচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন।
এদিকে এমভি মেঘনা প্রাইড সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দেখা গেছে, জাহাজটির অফিসিয়াল কাগজপত্রে এর মালিকানা মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডকইয়ার্ডের নামে রয়েছে। অথচ ওয়েবসাইটে জাহাজটির ওনার (মালিক) হিসেবে মাকান্টাইল শিপিং লাইন্স, ঢাকা, বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ম্যানেজার হিসেবেও একই প্রতিষ্ঠানকে দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের ঋণপত্রের মাধ্যমে বাজারদরের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত উচ্চমূল্যে জাহাজ ক্রয়, ঋণদাতা ব্যাংককে না জানিয়ে গোপনে তা বিক্রি এবং বিক্রির টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণ না করে ইস্টার্ন ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণের বিষয়টি স্পষ্টত জালিয়াতি। এসব অভিযোগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের পাশাপাশি ফৌজদারি আইনের ৪২০/৪০৬ দ-বিধিতে মামলা হতে পারে।
গোপনে জাহাজ বিক্রির তথ্য যেভাবে ফাঁস হয়
গত ১৩ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন ডিপার্টমেন্টের জেনারেল ম্যানেজারকে দেয়া ইস্টার্ন ব্যাংকের চিঠিতে (স্মারক নাম্বার-ইবিএল/এসডি/সিএমও/০৮৭৭/২০১২) উল্লেখ করা হয়, তাদের সম্মানিত গ্রাহক মেঘনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের অনুকূলে দুটি রেমিট্যান্স পেয়েছে। এর মধ্যে ৯২ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার, যা গত ৮ জুন ইতালির ক্যাসা ডি রিসপারমিও ডি ক্যারেরা ব্যাংক (ঈধংংধ ফর জরংঢ়ধৎসরড় ফর ঈধৎৎধৎধ ইধহশ) থেকে নাভেলমার (ইউকে) লিমিটেডের নির্দেশে দেয়া হয়েছে। অন্য রেমিট্যান্সটি ১০ লাখ ২৫ হাজার ২৩৭ দশমিক ২১ ডলারের, যা গত ১২ জুন ইউকের লয়েডস টিএসবি ব্যাংক থেকে হলম্যান ফেনউইক উইলানের (ঐড়ষসধহ ঋবহরিপশ ডরষষধহ) নির্দেশে তাদের গ্রাহক মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের অনুকূলে পাওয়া গেছে।
ইস্টার্ন ব্যাংকের ওই চিঠিতে আরো উল্লেখ রয়েছে, ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে মেঘনা শিপ বিল্ডার্স জানিয়েছে, তাদের সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজটি নেভালমারের (ইউকে) কাছে ১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলারে বিক্রির বিষয়টি চূড়ান্ত করে। লেনদেনের চুক্তি অনুযায়ী মোট মূল্যের ৯০ শতাংশ অর্থাৎ ৯২ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিটি ইস্টার্ন ব্যাংককে অগ্রিম দেয়া হয়েছে। জাহাজের মোট মূল্যের ১০ শতাংশ দু'পক্ষের পরামর্শক হলম্যান ফেনউইক ইউলানের কাছে সিকিউরিটি হিসেবে রাখা হয়েছিল, যা ইতোমধ্যে জাহাজ ডেলিভারি সংক্রান্ত সার্বিক পরিদর্শন শেষে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের রেমিট্যান্স প্রাপ্তির অ্যাডভাইসে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো জানিয়েছে, তারা জাহাজ বিক্রি বাবদ সর্বমোট ১ কোটি ২ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৭ দশমিক ২১ মার্কিন ডলার পেয়েছে। বাকি ৪ হাজার ৭৬২ দশমিক ৭৯ মার্কিন ডলার পরিদর্শন ও অন্যান্য ফি বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে। মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের দেয়া স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, জাহাজের নামে কোনো ঋণ নেই মর্মে মাকান্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের প্রত্যয়নপত্র ও মালিকানা হস্তান্তরের সি ফর্ম জমা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে উচ্চমূল্যে জাহাজ ক্রয় এবং পরবর্তীকালে তা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ব্যাংককে না জানিয়ে গোপনে অর্ধেক মূল্যে বিক্রির চাঞ্চল্যকর বিষয়টি বেশ কিছুদিন আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে। বিষয়টি জানতে পেরে মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের পাশাপাশি অগ্রণী ব্যাংকের বেশকিছু কর্মকর্তা এবং মাকান্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের একটি চক্র তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালায়। মোটা অংকের অর্থ উৎকোচ দিয়ে এবং একটি বিশেষ মহলের প্রভাব খাটিয়ে তারা তাদের এই মিশনে সফল হয়। গোপনে বিষয়টি আপসরফা করতে ওই চক্র তোড়জোড় উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
মেঘনা শিপ বিল্ডার্সের এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতির ঘটনা যাতে ধামাচাপা পড়ে না যায়, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তেও তার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করেন, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হলে অফিসিয়াল চ্যানেলে মানি লন্ডারিংয়ের 'প্যান্ডোরার বাক্স' খুলে যাবে, এ ধরনের ভয়ঙ্কর জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত রুই-কাতলাদের মুখোশ উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচারকারী সংঘবদ্ধ চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভেঙে যাবে, যা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো সুদৃঢ় রাখতে অত্যন্ত জরুরি।
 
পূর্ববর্তী সংবাদ
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত দিতে এখানে ক্লিক করুন
অনলাইন জরিপ
অনলাইন জরিপআজকের প্রশ্নউপজেলা নির্বাচনে অনিয়ম খুঁজে পাচ্ছে না নির্বাচন কমিশন_ ইসির এই দাবিকে আপনি সমর্থন করেন কি?হ্যাঁনাজরিপের ফলাফল
আজকের ভিউ
পুরোনো সংখ্যা
2010 The Jaijaidin